ঢাকায় জন্মাষ্টমী মিছিল (সূচনা-বিলুপ্তি-আরম্ভ)

শ্রাবণ বা ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষীয় অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাই এই দিনটি জন্মাষ্টমী হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশের ঢাকা শহরে জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা আয়োজিত হয়। এটি জন্মাষ্টমীর মিছিল বা জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা নামে পরিচিত। ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী মিছিল চারশ বছরের বেশি পুরনো এবং এটি একসময়ে ঢাকার অন্যতম প্রধান উৎসব ছিল যা অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হতো।
ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিল শুরু হয় ঢাকার আনুষ্ঠানিক নগরপত্তন(১৬১০ খ্রি) এরও পূর্বে। ১৫৫৫ সালে রাধাষ্টমীর সময় বংশাল এর নিকটে পিরু মুনশীর পুকুরের পাশে থাকা এক সন্ন্যাসী প্রথম বালক ভক্তদের হলুদ রঙের বসনে সাজিয়ে একটি মিছিল বের করেন। দশ বছর পর রাধাষ্টমীর পরিবর্তে কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমীর নন্দোৎসবের সময় তাদের মিছিলের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ১৫৬৫ সালে প্রথমবারের মত জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হয়। পরবর্তীকালে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাকের উপর মিছিলের দায়িত্ব অর্পিত হয়। কালক্রমে মিছিলটি বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং ঢাকায় জন্মাষ্টমী উদযাপনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। মুসলমানদের নিকট মিছিলটি ‘বার গোপালের মিছিল’ নামে পরিচিত ছিল।

কৃষ্ণদাস ঢাকার নবাবপুরে লক্ষ্মীনারায়ণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নবাবপুরের লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিল বের করা শুরু করেন। মিছিলে একটি কাঠের মঞ্চে কৃষ্ণ বলরাম নন্দ যশোদা প্রভৃতির বিগ্রহ থাকতো। মিছিলে বিভিন্ন মানুষ গোপ ও ব্রজবাসী সেজে ঘোড়ায় বা মাটিতে থেকে নাচগানে মুখর থাকতেন। বৈষ্ণব বসুকবৃদ্ধগণ পীতবসন পরে মাল্যপরিহিত হয়ে খোল করতালের বাদ্যে হরিনাম কীর্তন করতেন। কৃষ্ণদাসের মৃত্যুর পর চারপায়া বিশিষ্ট কাঠের চৌকিতে বিভিন্ন অবতারের মূর্তি প্রদর্শিত হয়। ধীরে ধীরে মিছিলে পতাকা, নিশান, বন্দুক-বর্শা, বল্লম-ছড়িধারী পদাতিক প্রভৃতি যুক্ত হয়। ক্রমেই বিভিন্ন সাজসজ্জায় মিছিলের গঠন ও কলেবর বৃদ্ধি পায়।

ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলে হাতি
কৃষ্ণদাসের প্রবর্তিত মিছিলের উৎকর্ষে অন্যান্য ধনী ব্যবসায়ীরাও নিজেদের স্থাপিত মন্দির থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিল বের করা শুরু করেন। উর্দুবাজারের গঙ্গারাম ঠাকুর নামে একজন বৈষ্ণব উর্দুবাজার থেকে মিছিল শুরু করে নবাবপুর পর্যন্ত নিয়ে আসতেন। তবে এই মিছিলটি কিছুদিন পরে বন্ধ হয়ে যায়। পন্নিটোলার গদাধর ও বলাইচাঁদ বসুর উদ্যোগে ইসলামপুরের মিছিল প্রবর্তিত হয়। ইসলামপুরের মিছিল ও নবাবপুরের মিছিলের মধ্যে একরকম প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয় যার ফলে উভয়পক্ষই মিছিলকে সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে অধিকমাত্রায় উদ্যোগী হয়। এসময় বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যায়িকার প্রতিফলন, বড়চৌকি, সোনারূপার চতুর্দোলা, হাতি, ঘোড়া, জরির সাজসজ্জা, গভর্মেন্টের পিলখানার হাতি প্রভৃতি জন্মাষ্টমীর মিছিলে সংযুক্ত হয়ে এটিকে আরও জমকালো করে তোলে।

ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিল পুরো বাংলায় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। এই মিছিল দেখতে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে শুরু করে কলকাতা শহর থেকেও মানুষ ঢাকায় আসত। দর্শনার্থীরা যেসব নৌকায় ঢাকা আসতেন সেগুলো সারাদিন বুড়িগঙ্গায় সারিবদ্ধভাবে নোঙ্গর করা থাকত। কখনও বৃষ্টির কারণে যথাসময়ে মিছিল শুরু করা যেত না, তবুও তাতে দর্শকের উৎসাহের কমতি ছিল না। [৩] এ মিছিলে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলিমরাও যোগ দিতেন। পরিতোষ সেন লিখেছেন “সক্রিয় অংশীদাররা হিন্দু হলেও আক্ষরিকভাবে এ মিছিল সর্বজনীন।” তার সামসময়িক কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন “জন্মাষ্টমীর মিছিল যেমন হিন্দু-মুসলমান নারী-পুরুষ সকলেরই কাছেই প্রিয় ছিল, মহরমের মিছিল তেমনটি ছিল না।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের পরে দুবছর বহু প্রতিবন্ধবতার মধ্যে দিয়ে মিছিল করা হয়। তবে ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মিছিলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।[৫] ঢাকার বহু ধনাঢ্য ও মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবার- যারা মিছিলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তারা ঢাকা ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় মিছিল অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে পড়ে। এছাড়া ধর্মান্ধ মুসলিমদের আক্রমণও মিছিল বন্ধের একটি কারণ।

ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিল মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ১৯৮৯ সালে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিল আয়োজিত হয়। মিছিলে কিছু আধুনিকায়ন থাকলেও এর মূল স্বরূপটি ধরে রাখার প্রয়াস করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার মেয়র জন্মাষ্টমীর মিছিলের উদ্বোধন করতেন। সেই ধারা বজায় রেখে ১৯৮৯ সাল হতে ঢাকার নির্বাচিত মেয়র মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বালনের মাধ্যমে মিছিলের উদ্বোধন করে আসছেন। বর্তমানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শুরু হওয়া জন্মাষ্টমীর মিছিল বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে একটি বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ
১) ঢাকার ইতিহাস, যতীন্দ্রমোহন রায়
২)ঢাকা সমগ্র, মুনতাসীর মামুন

নারায়ণগঞ্জ এর ইতিহাস

দেওভোগ লক্ষী নারায়ণ জিউর আখড়া’র ইতিহাসঃ

ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির নারায়নগঞ্জের সু প্রাচীন ও কেন্দ্রীয় মন্দির। ভগবান নারায়নের নামেই এই শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির আর এই মন্দিরের বিগ্রহের নামেই নামকরন করা হয় এই জেলার। প্রায় আড়াইশত বছর আগে ১৭৬৬ইং সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা বিকন লাল পান্ডে (বেণু ঠাকুর) তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট থেকে এ অঞ্চলের মালিকানা অর্জন করেন। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যায়ভার বহনের জন্য একটি দলিলের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী তৎকালীন খিজিরপুর মৌজার ‘গঞ্জ’ এলাকাটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মূলে মালিকানা অর্জন করে পরবর্তীতে তা বিগ্রহের সেবাপূজার-ব্যয়ভার করার নিমিত্তে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। যেহেতু ভীখণ লাল পান্ডে ভগবান নারায়ণের সেবক ও পূজারী ছিলেন তাই ভগবানের নাম অনুসারে পরবর্তীতে এ গঞ্জটি নারায়ণগঞ্জ নামকরণ করা হয়।

১৭৬৬ইং সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট হইতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়ার পর বাংলা ১১৭৩বাং সালেই শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি প্রায় আড়াই শতাধিক বৎসর যাবৎ অত্র মন্দিরটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ভগবানের সেবা-পূজার এক উৎকৃষ্ট সাধনাগার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কালের বিবর্তনে আজ মন্দিরের অধিকাংশ সম্পত্তি, ডোবা ও পুকুর (দিঘী) স্থানীয় প্রভাবশালী অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে।
মন্দির সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী জিউস পুকুর নামে খ্যাত দিঘীটি কালের আবর্তে আজ এক জীর্ণ পতিত নর্দমার রূপ ধারণ করে আছে।
দেওভোগ লক্ষ্মী-নারায়ণ আখড়ার মাঠে প্রতি বৎসর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। যা মাসব্যাপী অর্থাৎ পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।
মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই ১৭৬৭ সালে হিন্দু ব্যবসায়ীগণ তাদের বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১লা বৈশাখে আখড়ায় প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্মী-নারায়ণ বিগ্রহের চরণ ছুঁয়ে হালখাতা খুলতো। এই হালখাতা খোলার সাথেই জড়িত ছিল মেলা শুরুর পর্ব। এরপর প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হত মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা যা সুদীর্ঘ ২৫৩ বছর যাবৎ চলমান আছে।

সুপ্রাচীন এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় গীতা জয়ন্তী উৎসব, ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব, অন্নকোট, মাসব্যাপী শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা উৎসব, ৫৬ প্রহর ব্যাপী একনাম কীর্তণ, দোলযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান।
এছাড়াও অত্র মন্দিরকে ঘিরে আশেপাশে স্থাপন করা হয়েছে শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম, রাম-সীতা জিউর বিগ্রহ মন্দির, শিব মন্দির, শনি মন্দির এবং সম্প্রতি স্থাপন করা হয়েছে ইসকন মন্দির। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী জিউস পুকুরের উত্তর পাড়ে রয়েছে শনি মন্দির, শীতলা মন্দির এবং গৌরনিতাই জিউর বিগ্রহ মন্দির।

কালের সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দিরটি প্রায় আড়াইশত বছর পুরনো হওয়ায় বর্তমানে নতুনরূপে শ্রী শ্রী লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির নির্মাণ, মন্দিরের বাউন্ডারী, শ্রী শ্রী লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির বহুতল সেবা কমপ্লেক্স ও মন্দির অধীন অন্যান্য মন্দিরগুলো সংস্কার হচ্ছে।

©Pritom Pallav

Design a site like this with WordPress.com
Get started